বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন

Welcome! Thank you for visiting our newspaper website.
প্রধান সংবাদ :
গৌরনদীতে সম্পত্তি দখলের পাঁয়তারায় চলাচলের রাস্তা কেটে ফেলে নরসুন্দরকে নির্যাতন মানুষ মদিনার ইসলামে বিশ্বাসী, ‘মওদুদীর ইসলামে’ নয় : সালাহউদ্দিন আহমেদ কবে দেশে ফিরছেন তারেক রহমান, জানালেন পিএস নূরউদ্দিন অপু বাকেরগঞ্জে বিএনপি নেতাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার মামলায় ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার বানারীপাড়ায় অগ্নিকান্ডে দুটি বসত ঘর পুড়ে ছাই বরিশালে এখন সাংবাদিকতা মানে চা আর কমিশন! ট্রাম্পের ভাষণের সময় ইসরায়েলের পার্লামেন্টে ‘ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি’র দাবি তুলেছেন এমপি আইমান ও কাসিফ দ্রুত দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নিবেন তারেক রহমান বরিশাল মৎস্যজীবী দলের সভাপতি রুস্তম আলী মল্লিকের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের দোসরদের পুনর্বাসনের অভিযোগ বরিশালে সুরুজ গাজী হত্যার নেপথ্যে যুবদল নেতা উলফাত রানা রুবেলের চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারা!
মানবতার কবি নাজিম হিকমত যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন

মানবতার কবি নাজিম হিকমত যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন

universalnews24.com is an Bengali language news website of Bangladesh. It's edited and published by Jalal Ahmed Mridha (Journalist Ahmed Jalal).
Nazim Hikmet

আহমেদ জালাল : সারাটা জীবন যিনি সাধারণ মানুষের জন্য লড়েছেন, জ্বালাময়ী সব কবিতা লিখেছেন। শিল্পের জন্য, শিল্প বা কবিতার জন্য কবিতা নয়; বরং ‘মানুষের জন্য সবকিছু’ এই কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিলেন তিনি। মানুষের অধিকার আদায় আর শ্রেণি-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে জীবনের বেশিরভাগ সময় যাঁকে কাটাতে হয়েছে জেলে। তাঁকে বলা হয় জেলখানার কবি। যিনি শুধু তুরস্কের কবি নন, পৃথিবীর সমস্ত শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কবি। তাঁর প্রতিবাদী কবিতাগুলো মুক্তিকামী মানুষের কাছে চিরদিন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সারাজীবন সংগ্রাম করে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে নিঃসঙ্গ কারাবন্দী থেকে একমুহূর্তের জন্যেও দমে যাননি তিনি।
‘জেলখানার চিঠি’ তে তিনি লিখেছেন –“জল্লাদের লোমশ হাত যদি কখনো আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পরায়, নাজিমের নীল চোখে ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়”।
জেলখানার চিঠি কবিতাতে লিখেছেন, “মানুষের মুন্ডুটাতো আর বোটার ফুল নয় যে ইচ্ছে হলেই টান দিয়ে ছিড়ে নেবে!” এই প্রতিবাদী কবি’র নাম নাজিম হিকমত।
কবিতা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রতিবাদ। কবিতা যেকোন অস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র । ক্ষমতার কাছে নতজানু কবিতা নয়, বারুদগন্ধী কবিতা, বিস্ফোরণপ্রবণ কবিতা, নাজিম হিকমত, নেরুদা, মায়াকোভস্কি, নজরুলের কবিতা!
বলো, হিকমত-পুত্র, কোন শহরে তুমি মরতে চাও?
তুরস্ক থেকে যখন মানবতার কবি নাজিম হিকমতের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। তৎকালীন সময়ে তাঁর এক কবিতায় একবার নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন,‘বলো, হিকমত-পুত্র, কোন শহরে তুমি মরতে চাও?’ উত্তরে বলেছেন- ‘আমি মারা যেতে চাই ইস্তাম্বুলে, মস্কোয় এবং প্যারিসেও।……আমার মৃত্যুগুলোকে আমি পৃথিবীর উপর বীজের মতো ছড়িয়ে দিয়েছি, এর কিছু পড়েছে ওদেসায়, কিছু ইস্তাম্বুলে, আর কিছু প্রাগে। সবচেয়ে যে দেশকে আমি ভালবাসি সেটি হচ্ছে পৃথিবী। যখন আমার সময় আসবে, আমাকে পৃথিবী থেকে মুড়ে দিও।’

মানবতার কবি নাজিম হিকমত যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন

নাজিম হিকমত তাঁর কবিতায় শুধু তুরস্কের মানুষের মুক্তির কথাই বলেননি।তিনি সারা বিশ্বের মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। লিখেছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য জীবনে অসংখ্যবার কারাগারে যেতে হয়েছে তাঁকে। তবুও তিনি হার মানেননি। গেয়েছেন মানবতার জয়গান।
শব্দ-সৈনিক নাজিম হিকমত যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন সেই পৃথিবীকেই আমরা দেখতে চাই। আমরা বেঁচে থাকতে চাই সব থেকে সুন্দর সমুদ্র দেখতে, সবচেয়ে সুন্দর শিশুর বেড়ে ওঠা দেখার জন্য। আমরা বেঁচে থাকতে চাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো পাওয়ার জন্য।
নাজিম হিকমত (জন্ম : ১৫ জানুয়ারি, ১৯০২ – মৃত্যু : ৩ জুন, ১৯৬৩) বিংশ শতাব্দীর কবিদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী কবি তিনি। অটোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত সমরনায়ক নাজিম পাশা ছিলেন নাজিম হিকমতের দাদা। তুরস্কের আলেপ্পোয় নাজিম হিকমতের জন্ম হলেও সেখানে কখনো আর ফিরে যাননি তিনি। তবে একাধিকবার গিয়েছিলেন মস্কোতে। প্রথমবার মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। দ্বিতীয় বার তুরস্কের গোপন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে। তৃতীয়বার ১৯৫১ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে..মস্কোতে যান। আর ১৯৬৩ সালে মস্কোতেই মানবতার কবি নাজিম হিকমতের মহাপ্রয়াণ ঘটে। নাজিম হিকমত শুধু তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিই নন, তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সাহিত্যে হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর। তারপর সারাটা জীবন তিনি সমানে লিখেছেন। শুধু কবিতাই নয়, লিখেছেন বহু নাটক, ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও চিত্রনাট্য। করেছেন সাংবাদিকতাও। নাজিম হিকমতের জন্ম সম্ভ্রান্ত পরিবারে হলেও তিনি তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন সাধারণ মানুষের মুক্তিসংগ্রামে।
নাজিম হিকমত আত্মজীবনী কবিতায় লিখেন-
আমার জন্ম ১৯০২ সালে
আমি কখনো একবারের জন্যও
আমার জন্মভূমিতে ফিরে যাইনি
আমার ফিরে যেতে ভালো লাগে না
তিন বছর বয়সে আলেপ্পোতে আমি পাশার দৌহিত্রের ভূমিকায়
উনিশে মস্কো কমিউনিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে
ঊনপঞ্চাশে তেহেকা পার্টির অতিথি হয়ে ফিরে আসি মস্কোতে
চৌদ্দ যখন বয়স আমি কবি তখন থেকেই
কোনো কোনো মানুষ চারাগাছ সম্পর্কে সবকিছু জানে, মাছ সম্পর্কে কেউ কেউ
আমি জানি বিচ্ছেদ
কোনো কোনো মানুষ তারাদের নাম মুখস্থ বলতে পারে
আমি অনুপস্থিতির আবৃত্তি করি
আমি কারাগারে ঘুমিয়েছি, আর বিশাল হোটেলে
আমি জানি ক্ষুধা কেমন—এমনকি অনশনও আর কোনো খাবার
বলতে গেলে ছিলই না, আমি স্বাদ নিতে পারিনি
তিরিশ যখন আমার বয়স ওরা আমাকে ফাঁসি দিতে চেয়েছে
যখন আমি আটচল্লিশ তখন শান্তিপদক
পদক দিয়েছেও
ছত্রিশে আমি বছরের অর্ধেকটা সময় কেবল চার বর্গমিটার জায়গায়
অবস্থান করেছি
ঊনষাটে আঠারো ঘণ্টায় আমি প্রাগ থেকে হাভানা উড়ে এসেছি
আমি কখনো লেনিনকে দেখিনি ১৯২৪-এ তাঁর কফিন দেখতে দাঁড়িয়েছি
১৯৬১-তে তাঁর যে সমাধি দেখেছি তা কেবলই তাঁর রচনাবলি
ওরা আমাকে আমার পার্টি থেকে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করেছে
তাতে কাজ হয়নি
পতিত নেতাদের তলদেশে আমাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারেনি
১৯৫১-তে এক তরুণ বন্ধুকে নিয়ে পাল তুলে দিই মৃত্যুর চোয়ালের দিকে
১৯৫২-তে ভগ্নহূদয় মৃত্যুর দিন গুনে গুনে চার মাস শুয়ে থাকি চিৎ হয়ে
আমার ভালোবাসার নারীদের ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত হই
চার্লি চ্যাপলিনকে একটুও ঈর্ষা করিনি
আমি আমাদের নারীদের প্রতারণা করেছি
আমি কখনো বন্ধুদের কথার জবাব দিইনি
আমি পান করেছি কিন্তু প্রতিদিনই নয়
আমার রুটির পয়সা একই সঙ্গে কামাই করে নিয়েছি
যাদের আমি মিথ্যা বলেছি তাদের বিব্রতকর অবস্থায় কী মজা
কাউকে আঘাত করতে আমি মিথ্যা বলিনি
তবে আমি অকারণেও মিথ্যা বলেছি
আমি ট্রেন, উড়োজাহাজ আর গাড়ি চড়েছি
অধিকাংশ মানুষেরই এ সুযোগ হয় না
আমি অপেরায় গিয়েছি
অধিকাংশ মানুষ অপেরার নাম শোনেনি
আর ১৯২১ থেকে আমি যেসব জায়গায় যাইনি অধিকাংশ মানুষ যেখানে যায়
মসজিদ, গির্জা, মন্দির, সিনাগগ, জাদুকরের তামাশা
তবে আমি আমার কফির জমিন পাঠ করেছি
তিরিশ কি চল্লিশটি ভাষায় আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে
কিন্তু আমার তুরস্কে আমার তুর্কি ভাষায় তা নিষিদ্ধ।
ক্যানসার আমাকে এখনো পেয়ে বসেনি
পেয়ে বসবে এমনও কেউ বলেনি
আমি কখনো প্রধানমন্ত্রী কিংবা ও-রকম কিছু হতো না
আর সে জীবন আমি চাইও না
আমি যুদ্ধেও যাইনি
কিংবা রাত্রিশেষে বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে বিবরে ঢুকিনি
বোমারু জাহাজের ঊষর রাস্তা কখনো বেছে নিইনি
কিন্তু প্রায় ষাট বছর বয়সে প্রেমে পড়েছি
সংক্ষেপে কমরেড
এমনকি আজও বার্লিনে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমি কঁকাচ্ছি
আমি বলতে পারি আমি মানুষের জীবনযাপন করেছি
আর কে জানে
আমি আর কত দীর্ঘকাল বাঁচব
আর আমার কী ঘটবে
জেলে যাবার পর কবিতায় হিকমত লিখেছেন-
‘আমি জেলে যাবার পর
সূর্যকে গুনে গুনে দশবার প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী
আর আমি বারম্বার সেই একই কথাই বলছি
জেলখানায় কাটানো দশটা বছরে
যা লিখেছি সব তাদেরই জন্যে
যারা মাটির পিঁপড়ের মতো
সমুদ্রের মাছের মতো
আকাশের পাখির মতো অগণন
যারা ভীরু, যারা বীর
যারা নিরক্ষর, যারা শিক্ষিত
যারা শিশুর মতো সরল
যারা ধ্বংস করে, যারা সৃষ্টি করে,
কেবল তাদেরই জীবনকথা মুখর আমার গানে।’
নাজিম হিকমত তার কবিতায় শুধু তুরস্কের মানুষের মুক্তির কথাই বলেননি। বলেছেন সারা বিশ্বের মানুষের মুক্তির কথা। লিখেছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। গেয়েছেন মানবতার জয়গান। তুরস্ক থেকে যখন তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় তখন হিকমত তার কবিতায় লিখেছেন-
‘বলো, হিকমত-পুত্র, কোন শহরে তুমি মরতে চাও?’ উত্তরে বলেছেন- ‘আমি মারা যেতে চাই ইস্তাম্বুলে, মস্কোয় এবং প্যারিসেও।……আমার মৃত্যুগুলোকে আমি পৃথিবীর উপর বীজের মতো ছড়িয়ে দিয়েছি, এর কিছু পড়েছে ওদেসায়, কিছু ইস্তাম্বুলে, আর কিছু প্রাগে। সবচেয়ে যে দেশকে আমি ভালবাসি সেটি হচ্ছে পৃথিবী। যখন আমার সময় আসবে, আমাকে পৃথিবী থেকে মুড়ে দিও।’
কবি সুভাস মুখোপাধ্যায় লিখেছেন-‘ নাজিমের কবিতায় যে সর্বজনীনতা, তার শিকড় রয়েছে বিশেষভাবে তার স্বদেশের মাটিতেই। নাজিমের জীবন আর তার কাব্য অভিন্ন। তার কবিতাই তার জীবনের ইতিবৃত্ত। সমসাময়িক তুরস্কের ধারাবিবরণ তার কবিতায়। তাই নাজিমের সব কবিতা কালানুক্রমে সাজালে তুরস্কের ইতিহাস বাক্সময় হয়ে উঠবে।’

জেলখানার চিঠি – নাজিম হিকমত


প্রিয়তমা আমার
তেমার শেষ চিঠিতে
তুমি লিখেছ ;
মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে
দিশেহারা আমার হৃদয়।
তুমি লিখেছ ;
যদি ওরা তেমাকে ফাঁসী দেয়
তেমাকে যদি হারাই
আমি বাঁচব না।
তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার
আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে
তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী,
বিংশ শতাব্দীতে
মানুষের শোকের আয়ূ
বড় জোর এক বছর।
মৃত্যু……
দড়ির এক প্রান্তে দোদুল্যমান শবদেহ
আমার কাম্য নয় সেই মৃত্যু।
কিন্তু প্রিয়তমা আমার, তুমি জেনো
জল্লাদের লোমশ হাত
যদি আমার গলায়
ফাসীর দড়ি পরায়
নাজিমের নীল চোখে
ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে
ভয়।
অন্তিম ঊষার অস্ফুট আলোয়
আমি দেখব আমার বন্ধুদের,তোমাকে দেখব
আমার সঙ্গে কবরে যাবে
শুধু আমার
এক অসমাপ্ত গানের বেদনা।

বধু আমার
তুমি আমার কোমলপ্রাণ মৌমাছি
চোখ তোমার মধুর চেয়েও মিষ্টি।
কেন তোমাকে আমি লিখতে গেলাম
ওরা আমাকে ফাঁসী দিতে চায়
বিচার সবে মাত্র শুরু হয়েছে
আর মানুষের মুন্ডুটা তো বোঁটার ফুল নয়
ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেবে ।
ও নিয়ে ভেবনা
ওসব বহু দূরের ভাবনা
হাতে যদি টাকা থাকে
আমার জন্যে কিনে পাঠিও গরম একটা পাজামা
পায়ে আমার বাত ধরেছে।
ভুলে যেও না
স্বামী যার জেলখানায়
তার মনে যেন সব সময় ফুর্তি থাকে
বাতাস আসে, বাতাস যায়
চেরির একই ডাল একই ঝড়ে
দুবার দোলে না।
গাছে গাছে পাখির কাকলি
পাখাগুলো উড়তে চায়।
জানলা বন্ধ:
টান মেরে খুলতে হবে।
আমি তোমাকে চাই ;তোমার মত রমনীয় হোক জীবন
আমার বন্ধু,আমার প্রিয়তমার মত……..।
আমি জানি,দুঃখের ডালি
আজও উজাড় হয়নি
কিন্তু একদিন হবে।

নতজানু হয়ে আমি চেয়ে আছি মাটির দিকে
উজ্জল নীল ফুলের মঞ্জরিত শাখার দিকে আমি তাকিয়ে
তুমি যেন মৃন্ময়ী বসন্ত,আমার প্রিয়তমা
আমি তোমর দিকে তাকিয়ে।
মাটিতে পিঠ রেখে আমি দেখি আকাশকে
তুমি যেন মধুমাস,তুমি আকাশ
আমি তোমাকে দেখছি প্রিয়তমা।
রাত্রির অন্ধকারে,গ্রামদেশে শুকনো পাতায় আমি জ্বালিয়েছিলাম আগুন
আমি স্পর্শ করছি সেই আগুন
নক্ষত্রের নিচে জ্বালা অগ্নিকুন্ডের মত তুমি
আমার প্রিয়তমা, তোমাকে স্পর্শ করছি।
আমি আছি মানুষের মাঝখানে,ভালবাসি আমি মানুষকে
ভালবাসি আন্দোলন,
ভালবাসি চিন্তা করতে,
আমার সংগ্রামকে আমি ভালবাসি
আমার সংগ্রামের অন্তস্থলে মানুষের আসনে তুমি আসীন
প্রিয়তমা আমার আমি তোমাকে ভালবাসি।

রাত এখন ন’টা
ঘন্টা বেজে গেছে গুমটিতে
সেলের দরোজা তালা বন্ধ হবে এক্ষুনি।
এবার জেলখানায় একটু বেশি দিন কাঁটল
আট্টা বছর।
বেঁচে থাকায় অনেক আশা,প্রিয়তমা
তোমাকে ভালবাসার মতই একাগ্র বেঁচে থাকা।
কী মধুর কী আশায় রঙ্গীন তোমার স্মৃতি….।
কিন্তু আর আমি আশায় তুষ্ট নই,
আমি আর শুনতে চাই না গান।
আমার নিজের গান এবার আমি গাইব।
আমাদের ছেলেটা বিছানায় শয্যাগত
বাপ তার জেলখানায়
তোমার ভারাক্রান্ত মাথাটা ক্লান্ত হাতের ওপর এলানো
আমরা আর আমাদের এই পৃথিবী একই সুচ্যগ্রে দাঁড়িয়ে।
দুঃসময় থেকে সুসময়ে
মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে
আমাদের ছেলেটা নিরাময় হয়ে উঠবে
তার বাপ খালাস পাবে জেল থেকে
তোমার সোনালী চোখে উপচে পড়বে হাসি
আমার আর আমাদের এই পৃথিবী একই সুচ্যগ্রে দাঁড়িয়ে !

যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর
তা আজও আমরা দেখিনি।
সব থেকে সুন্দর শিশু
আজও বেড়ে ওঠে নি
আমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলো
আজও আমরা পাইনি।
মধুরতম যে-কথা আমি বলতে চাই।
সে কথা আজও আমি বলি নি।

কাল রাতে তোমাকে আমি স্বপ্ন দেখলাম
মাথা উঁচু করে
ধুসর চোখে তুমি আছো আমার দিকে তাকিয়ে
তোমার আদ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান
কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না।
কৃষ্ণপক্ষ রাত্রে কোথাও আনন্দ সংবাদের মত ঘড়ির টিক্ টিক্ আওয়াজ
বাতাসে গুন্ গুন্ করছে মহাকাল
আমার ক্যানারীর লাল খাঁচায়
গানের একটি কলি,
লাঙ্গল-চষা ভূঁইতে
মাটির বুক ফুঁড়ে উদগত অঙ্কুরের দুরন্ত কলরব
আর এক মহিমান্বিত জনতার বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত ন্যায্য অধিকার
তোমার আদ্র ওষ্ঠাধর কম্পু
কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না।
আশাভঙ্গে অভিশাপ নিয়ে জেগে উঠলাম।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বইতে মুখ রেখে।
অতগুলো কণ্ঠস্বরের মধ্যে
তোমার স্বরও কি আমি শুনতে পাই নি ?
অনুবাদ : সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
নাজিম হিকমত ১৯২২ সালের জুলাইয়ে মস্কো যান। ‘কমিউনিস্ট ইউনির্ভাসিটি অব দ্যা টইলার্স অব দ্যা ইস্ট’-এ অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন উপনিবেশিক দেশের কমিউনিস্ট কর্মীদের পড়াশুনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এখানে হিকমতের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত কবি ভ্লদিমির মায়াকোভস্কি এবং থিয়েটার বিশারদ ভেসেভুলুড মেয়েরহোল্ডে সাথে পরিচয় হয়। যা পরবর্তীতে তাঁর শিল্প চর্চায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির ইলিচ লেনিনের মতাদর্শ হিকমতের রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে বেশ সমৃদ্ধ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সমস্ত জীবনে প্রয়োগ হতে দেখা যায়। কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে তাঁর কবিতা আরো প্রতিবাদী হয়ে উঠে। ১৯২৪ সালে তুরস্ক স্বাধীনতা অর্জন করে। এরপর মুক্ত তুরস্কে হিকমত ফিরে আসেন। ওই সময় তিনি একটি বামপন্থি পত্রিকায় কাজ করেন। সেখানে বাম মতাদর্শে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার দায়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু হিকমত তুরস্ক থেকে রাশিয়ায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তৎকালীন সময়ে তিনি বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কবিতা এবং গান রচনা করেন। ১৯২৮ সালে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দেয়া হলে তিনি আবার তুরস্কে ফিরে আসেন। ততদিনে তুরস্কের কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাঁকে সবসময় নজরবন্দি করে রাখত। এতকিছুর পরও হিকমতকে দমিয়ে রাখা যায়নি। শোষিত মানুষ এবং নিপীড়িত জনতার কণ্ঠস্বর তাঁর কবিতায় দেখা যায়। এরফলে তুরস্কের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের কাছে তিনি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান। ১৯২৮ সাল পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে তাকে পাঁচ বছর কারাগারে বন্দি থাকতে হয়। এ সময় তিনি নয়টি কবিতার বই প্রকাশ করেন। কাব্য চর্চায় তাঁর অনুভব তুরস্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী স্পর্শ করে। প্রতিক্রিয়াশীলরা তাঁকে জেলে বন্দি রেখেও স্বস্তি পায়নি। ১৯৩৮ সালে হিকমতকে দীর্ঘমেয়াদে গ্রেফতার করা হয়। এবারের অভিযোগ গুরুতর। শাসক শ্রেণীর মতে, তাঁর কবিতা সামরিক বাহিনীতি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হচ্ছে, তাঁর কবিতা মিলিটারি ক্যাডেটরা পড়ছে এবং বিপ্লবের চেতনা জন্ম দিয়েছে। বিচারে তাঁর ২৮ বছর সাজা হয়। ১৯৪৯ সালে চিলির বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা, গণসঙ্গীত শিল্পী পল রবসন এবং দার্শনিক জ্যা পল সার্ত্রে তার মুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুক্তির দাবিতে তাঁরা আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করেন। ১৯৫০ এর ২২ ডিসেম্বর হিকমত পাবলো নেরুদার সাথে যৌথভাবে বিশ্ব শান্তি পুরস্কার জিতে নেন। এ বছর তিনি আঠারো দিনের আমরণ অনশনে যান। তুরস্কের গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে তিনি মুক্তি অর্জন করেন। প্রতিক্রিয়াশীলরা তাঁর পিছু ছাড়ছিল না। তাকে দু’বার হত্যার প্রচেষ্টাও চালানো হয়। পরবর্তীতে তিনি আবার কৃষ্ণ সাগর হয়ে রাশিয়ায় পালিয়ে আসেন। ওই সময় তুরস্কের সরকার তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করে। ১৯৬৩ সালের ৩ জুন সকালে দরজা থেকে সংবাদপত্র নেবার সময় হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে এ মহান কবি মস্কোয় মহাপ্রয়াণ ঘটে।
মানবতার কবি নাজিম হিকমত লিখেছেন- ‘সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত, সংগ্রাম আর প্রেরণা, জয়, পরাজয় আর জীবনের ভালবাসা, খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সব ক’টি দিক। সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে মানুষকে মিথ্যা ধারণা দেয় না।’
যেহেতু বিপ্লবী কবিতা যেকোন অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে সেহেতু মানবতার কবি নাজিম হিকমত এর মত কবিদের কবিতার বিপ্লবে এই পৃথিবী আরো মানবিক হোক।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.com
Design By Ahmed Jalal.
Design By Rana